✶ রোজনামচা – ২৬.১০.২০১১ ✶

আগামীকাল আমাদের কনভোকেশান। আজ অনেক ব্যস্ত একটা দিন গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দৌড় অডিটোরিয়ামে। কনভোকেশানের রিহার্সেল হলো। ইয়া বিশাল একটা গাউন, হ্যাট আরেকটা কি জানি আছে আমি ঠিক নাম জানিনা ওটার – এসব পরে কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিল আমাদের। সবকিছু কেমন জানি অভিনয় অভিনয় মনে হচ্ছিল। K.K. স্যার প্রধান অতিথির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

দুপুরে মামারা এসে রুম পরিষ্কার করে দিয়ে গেলেন। এরপর জামাকাপড় কাঁচলাম । বিকেলে আমি, মিশুক আর আব্বু মিলে গেলাম আমাদের নতুন ভাড়া করা বাসা দেখতে। ২ তারিখের পর আমাদের হল ছেড়ে দিতে হবে। তাই এই অগ্রীম বাসা দেখাদেখি। অনেক হাঁটাহাঁটি হলো। ফেরার পথে আব্বুর জন্য টিকিট কেনা, ফিরে এসে জুতা পালিশ করিয়ে আনা, লণ্ড্রী থেকে কাপড় আয়রন করানো -সারাদিনে কাজ কি কম করেছি নাকি?

এত ব্যস্ততার পরও আজকের দিনটা কেমন জানি ঈদ ঈদ মনে হচ্ছিল। কনভোকেশান আমার কাছে তেমন স্পেশাল কিছু না, তারপরও সবার আনন্দ দেখে কেন জানি নিজেকেও খুশি খুশি লাগছিল। মিশুক আজ খুব ক্লান্ত। এখন ঘুমাচ্ছে। গত রাতে ঘুমায়নিতো, তার ওপর আজ সারাদিন অনেক ধকল গেছে ওর ওপর দিয়ে। ইমরানটা অনেকটা টিপিক্যালই ছিল।

আচ্ছা, আমার কি খারাপ লাগবে আইইউটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর? লাগবে বলে মনে হয়না। ফ্রেন্ডদের মিস করব তবে সেটা বোধয় খুব দ্রুতই অন্য কারও দ্বারা পূরণ হয়ে যাবে। এবারই তো প্রথম না- সেই স্কুল থেকে শুরু, ভায়া কলেজ এন্ড হোস্টেল। মনটা এখন আর বাচ্চাদের মত নাই, অনেক শক্ত হয়ে গেছে। তবে আইইউটির নিশ্চিন্ত জীবনটাকে মিস করব নিঃসন্দেহে। হয়তো খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ব, জীবিকার তাগিদে দৌড়াতে হবে অনেক। ব্যাপারস না। সয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

কষ্টতো খুব একটা কম করিনি জীবনে। প্রায় সব রকমের অভিজ্ঞতাই আছে। প্রতিদিন সেই (৮+৮=১৬) কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া, ক্লাশ এইটে স্কলারশীপ পাইনি বলে অনেক অনেক হীনমন্যতায় ভোগা, অমানবিক পরিশ্রম করে যাওয়া, ভাল রেজাল্ট করার পর উদাসীনতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া – কোন অভিজ্ঞতটা নাই?

যাহোক, আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন কি আছে কপালে। আল্লাহর উপর ভরসা আছে আমার। আইইউটি লাইফে এই একটা জিনিসই অনেক বড় অর্জন আমার। আল্লাহর রহমতে মোটামুটি সব বিষয়কেই সহজভাবে নিতে পারি। এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি হতে পারে।

কাউকে কি মিস করছি আমি? জানিনা। আমার মাকে? হুম। আমার পুরো ব্যাসিকটাইতো উনার হাতে তৈরি। উনাকে না মিস করে উপায় কি? আমি জানি সারাদিন স্কুল করার পর কি অমানবিক পরিশ্রমেই না আমাকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে । ক্লাশ এইটের স্কলারশীপ পরীক্ষা চলছে। ইংলিশ পরীক্ষা। প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছি কোন এক সহপাঠীর কাছ থেকে। কোনমতেই কান্না ধরে রাখতে পারছিনা। রাগ করে বের হয়ে চলে এসেছি পরীক্ষার হল থেকে। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি- আমি কাঁদব না। কোনমতেই পারছিনা। আমি জানতাম ওটাই আমার শেষ সুযোগ না, আরও অনেক সুযোগ আসবে আমার। ছোট মানুষ ছিলাম তো, নিজেকে বোঝাতে পারিনি ঠিকমতো।

কিছু কিছু ঘটনা থাকে যেগুলো মানুষের ভেতর জেদ ছড়িয়ে দেয়। আমার ভেতরও প্রচণ্ড জেদ আসে। এমন একটা সময় ছিল যখন পড়াশোনা করাটা আমার কাছে গেমের মত হয়ে গিয়েছিল। মানুষের গেম খেলতে ভাল লাগে, আমার তখন পড়তে ভাল লাগতো। আর কিচ্ছু করতাম না। ১ টা সেকেন্ডও থাকতামনা পড়া ছাড়া। আমার মনে আছে বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়টাও বসে থাকতে ইচ্ছা করতোনা আমার। রাস্তাতেই বই খুলে পড়তাম। মানুষ যা বলবে বলুক গা, আমার কি? আমার মনে হয়, ক্লাশ নাইন থেকে টেন এই দুই বছরে আমি যে পরিমান পড়াশোনা করেছি তার চেয়ে অনেক কম পড়েছি অন্যান্য ১৫ বছরে (ক্লাশ ওয়ান থেকে এইট+এইচ.এস.সি+বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং) ।

পুরো কলেজ লাইফটা চলেছি গতি জড়তার ওপর। কলেজে পড়াশোনা করিনি মোটেই। resedual এর জোরে চলেছি। তারপরও আল্লাহর রহমতে রেজাল্ট খারাপ হয়নি। বিএসসিতে গা এলিয়ে দিয়েছি আরও বেশি। তারপরও আমার রেজাল্টে আমি সন্তুষ্ট।

ক্লাশ এইট-টেন এই দুই বছরে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা পেয়েছি সেটা হচ্ছে আমি কারও চেয়ে ছোট না কোন কিছুতেই । পৃথিবীর সব কিছুই করার সামর্থ আমার আছে ইনশাল্লাহ। আর কলেজ লাইফটা ছিল ভূল করার সময়। যে ভূলটা আইইউটি লাইফের মাঝামাঝিতে এসে ধরতে পেরেছি।

আইইউটি থেকে যে শিক্ষাটা নিয়ে বের হচ্ছি সেটা হচ্ছে- মানুষ চাইলেই হয়তো অনেক কিছু করতে পারে, আল্লাহ তাকে সে সুযোগ দিয়েছেন অনেক ক্ষেত্রেই। তবে কোন সময়ই নীতির সাথে আপোষ করা উচিত না। হয়তো আমি গ্রামের এক কৃষক হব, হইনা। কে বলেছে আমাকে অনেক বড় কিছু হতে হবে? মানুষের জীবনের সবকিছুই পূর্ব নির্ধারিত। কাজেই বেশি তাপালিং করে লাভ নাই। পারতপক্ষে সিম্পল ও সৎ জীবন যাপন করতে হবে। কোটি কোটি টাকা বা খ্যাতি মানুষকে সাময়ীক সুখ দিতে পারে, স্থায়ী সুখ কখনই নয়। স্থায়ী সুখ পেতে হলে পুরোপুরি ইসলাম অনুসরণের কোন বিকল্প নাই। আর সেটা সবরকম পরিস্থিতিতেই করা যায়। হয়তোবা কখনো কখনো একটু কঠিন হবে, তবে সম্ভব। মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ইসলাম পুরোপুরি অনুসরণ করা, বাকীগুলো গৌন বিষয়। হলে ভাল, নাহলে সমস্যা নাই। ইসলামকে গৌন বিষয় ধরে বাকিগুলোকে মৌলিক বানিয়ে নেওয়ার যে ট্র্যাডিশান চেইন বিক্রিয়া আকারে চলে আসছে সেটার কারণেই যত সমস্যার সৃষ্টি। চেইন বিক্রিয়াটা চলুক তবে ট্র্যাডিশানটা পালটে যাক। এ কাজটা করতে গেলে নানা ঝামেলা আসবে। আসুক। লক্ষ্যে পৌঁছানোটাই বড় কথা, রাস্তায় কত কষ্ট হলো সেটা না।

3 responses to “✶ রোজনামচা – ২৬.১০.২০১১ ✶

  1. ১।
    আমি যখন মন্তব্যটা করছি, ততক্ষণে তোমরা গ্রাজুয়েট হয়ে গিয়েছ। বিশাল অভিনন্দন রইল আমার পক্ষ থেকে।

    ২।
    আইইউটি আমাকে দিয়েছে অনেক কিন্তু আমি কিছুই দেইনি এখনো!😦 ইনশাল্লাহ অবশ্যই কিছু না কিছু দেব।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s