আমার যা ছিল তা নিয়ে গেল যা নেই তার ক্ষোভে!

এই মুহূর্তে কেউ যদি প্রশ্ন করে দিনকাল কেমন চলছে, কোন কিছু না ভেবেই উত্তর দেব বেশ সুখে আছি। মাঝে মাঝে ২-১ টা না পাওয়া যে নাই তা না, তবে সেগুলো খুবই নগন্য। বড়সড় চাওয়া বলতে একটা আছে। গ্রাজুয়েশান ঠিকমতো শেষ করে একটা মোটামুটি চাকুরি পেলে সেটাও পূরণ হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। আর ছোটখাট না পাওয়াগুলোতো থাকবেই। সেগুলোকে ধর্তব্যের ভেতর নিলে জীবন চালানো যাবেনা। “ইস! আমার সিজিপিএ যদি আরেকটু বেশি হতো! পরীক্ষা খারাপ হয়েছে মন খারাপ। আজ ১ মার্কসের এন্সার করতে পারিনি। আমার যদি একটা আই-প্যাড থাকতো! একটা গাড়ি কেনার খুব শখ আমার, ঢাকায় একটা বাড়ি না থাকলে কি চলে?” এই টাইপ ইচ্ছা, আকাঙ্খা, আক্ষেপগুলো আমাকে এখন আর স্পর্শ করেনা আল্লাহর রহমতে। মন থেকে বলতে পারি, “এই বেশ ভাল আছি!”

কার কাছে যেন শুনেছিলাম পৃথিবীতে আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত হচ্ছে “শারীরিক সুস্থ্যতা”। আমারও তাই মনে হয়। আল্লাহ কত কিছু দিয়েছে আমাকে! চোখে চশমা পর্যন্ত ওঠাতে হয়নি আল্লাহর রহমতে। অনেকের শুনি মাইগ্রেনের ব্যাথা ইত্যাদি ইত্যাদি। আল্লাহর রহমতে এরকম কিছুতে এখনও ভুগতে হয়নি আমাকে। এইরকম অঢেল নিয়ামত থাকার পরও নিজের ছোটখাট অপ্রাপ্তিতে দুঃখিত হই কিভাবে! হে আল্লাহ তোমাকে মন থেকে ধন্যবাদ শারিরীক সুস্থ্যতার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ।

গত কয়েকদিন আগে ইমরানের পিসিতে ভিডিও দেখলাম একটা। খুব খারাপ লাগলো। একজন লোকের দুটো হাতই নাই। তারপরও সবকিছুই করেন তিনি এবং তিনি সুখী, তার মনে দুঃখ নাই। নামজের জন্য যখন ওযু করছিলেন তখন তার কষ্ট টের পেলাম। একটু ভেবে দেখুন দুই হাত ছাড়া কুলি করা, মুখ ধোয়া, মাথা মসেহ করা কতটা কঠিন। এই কঠিন কাজটা নিয়মিত করে চলছেন তিনি। পা দিয়ে মুখ ধোয়া ও মাথা মসেহ করেন তিনি। একবার চেষ্টা করে দেখুন তো হাতের কোন রকম সাহায্য ছাড়া পা দিয়ে মুখ মুছতে এবং মাথা মসেহ করতে পারেন কিনা?

এত কষ্টকর হবার পরও তিনি নিয়মিত নামাজ পড়ে যাচ্ছেন, এবং খুশি। আর আমরা? সবকিছু ঠিক আছে শুধুমাত্র কিছু সময় খরচ করে নিয়মিত নামাজ পড়িনা আলসেমী বা অবহেলার কারণে। কাল সকালে যদি আমার দুটো হাত বা দুটো পা অকেজো হয়ে যায়? সারা শরীর না, শুধুমাত্র হাতটা অকেজো হয়ে গেছে ধরে চিন্তা করুন কিছুক্ষনের জন্য। পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার মনে হচ্ছেনা? আর এই আমি আপনিই এখন ছুটে বেড়াচ্ছি যা নাই তার জন্য। যা আছে তার গুরুত্ব নাই আমাদের কাছে।

পরীক্ষায় একটু খারাপ রেজাল্ট করেছি তাই সারাদিন মন খারাপ করে বসে আছি এ প্লাস পেলামনা কেন? আমার জীবনটাই বরবাদ হয়ে গেল। আমি বেকার কেন? আমি কিভাবে বাঁচব? এস.এস.সি. এইচ.এস.সি. তে খারাপ রেজাল্ট করে আমার লাইফটাই বরবাদ হয়ে গেছে। আমি ভাল জায়গায় ভর্তি হতে পারিনা কেন? হাজার হাজার না পাওয়ার বেদনা এবং আক্ষেপে জীবনকে শেষ করে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত!

জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা কখনো শেষ হয়ে যায়না, যে কোন জায়গা থেকেই সুখী হওয়া যায় যদি আপনার/আমার সুখী হবার মানসিকতা থাকে। কি পাইনি সেটা বাদ দিয়ে আমি কি কি পেয়েছি সেটার একটা লিস্ট করে দেখি আসুন তো। হাত্‌, পা, চোখ, কান থেকে আরম্ভ করুন এবং ইন্টারনেটে এসে থামুন। আপনি আমি ইন্টারনেট পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারছি এর মানে আমাদের ভেতরও সুখী হবার পর্যাপ্ত উপকরণ আছে। হাস্যকর মনে হচ্ছে? হাসপাতালে চরম বেদনায় কাতর রোগীকে কখনও টেলিভিশন দেখতে দেখেছেন? টেলিভশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি মানুষ তখনই ব্যবহার করে বা ব্যবহারের মানসিকতা থাকে যখন সে সুখে থাকে বা সুখে থাকার পর্যাপ্ত উপকরণ তার হাতে থাকে।

আরেক ধরণের আক্ষেপবাদী বা হতাশাগ্রস্তদের ইদানিং খুব দেখা যায়, “এখন পর্যন্ত একটাও প্রেম করতে পারলাম না, একা একা আর ভাল লাগেনা, গার্লফ্রেণ্ড না থাকলে এটা কোন জীবন হলো, আমার গার্লফ্রেণ্ডটা দেখতে সুন্দর না, ইস আমার যদি একটা সেইরকম গার্লফ্রেণ্ড থাকতো! ও আমারে ছেড়ে চলে গেছে, আমার জীবনটাই বাদ। আমার একদিকে পৃথিবী আর একদিকে শুধু তুমি (ওরে মারে! সারছে!), ব্লা… ব্লা… ব্লা…” । লজ্জা লাগছে? লাগার কিছু নাই। আমরা সাধারণত এরকমই । চোখের সামনে একটা পর্দা টাঙ্গানো আছে। সেই পর্দাটা আমাদের সুখগুলোকে আড়াল করে রাখছে আর সবসময় কুমন্ত্রনা দিচ্ছে তোমার এটা নাই, তোমার ওটা নাই্‌ তোমাকে এটা করতে হবে, ওমুক এটা করে ফেলেছে তুমি কবে করবা?

সুখী হবার জন্য আমাদের বেশি কিছুর দরকার নাই। শুধু দৃষ্টিভঙ্গীটা একটু পরিবর্তন করা দরকার, আপনার যা আছে তা-ই সুখী হবার জন্য যথেষ্ট। আপনার হাতে ছক্কার মার নাই? সো হোয়াট? চার মারুন। চারের মারও নাই? সিঙ্গেল নিতে থাকুন। প্রতি বলে সিঙ্গেল নিতে থাকলেও কিন্তু ৩০০ রান হয় ৫০ ওভারে। আফসোস আমরা খালি চার ছক্কার পেছনে ছুটি।

ভাবুন। আমিও ভাবি। কিভাবে সেইরকম একটা গার্লফ্রেণ্ড হবে সেটা নিয়ে যতটা ভেবেছেন বা অহেতুক সুখ-কল্পনা করেছেন ততটা কি ভেবেছেন কিভাবে আব্বু, আম্মু, ভাইবোনদের খুশী করা যায়? আমিও কি ভেবেছি? আমাদের সবচেয়ে বড় বোকামী হচ্ছে যখন যেটা থাকেনা সেটা নিয়ে বেশি ভাবতে ভাবতে যেটা আছে সেটাকে অবহেলা করতে থাকি। অথচ যেটা আছে সেটাই সুখী হবার জন্য যথেষ্ট, দরকার শুধু উপযুক্ত পরিচর্যার। শুধু শুধু উচ্চাকাঙ্খা করে মন খারাপ করার চেয়ে যেটা আছে সেটা নিয়ে সুখী হবার চিন্তা করাটা বেশি ভাল । সময় হলে আকাঙ্ক্ষা এমনিই পূরণ হবে, চারপাশ ভুলে আপনি যত বেগে আকাঙ্খার পেছনে ছুটবেন সুখ তত বেগেই দূরে সরে যাবে আপনার থেকে। কাজেই যা নেই তার ক্ষোভে যা আছে তা হারিয়ে যেতে দেওয়াটা বোকামীর কাজ।

11 responses to “আমার যা ছিল তা নিয়ে গেল যা নেই তার ক্ষোভে!

  1. সত্যি ভাই, দারুন লিখেছেন। বিশ্বাস করেন আর না করেন মনে হচ্ছে এই লেখাটা পড়ে আমি বদলে গেছি। এটা আমার মনে বিশাল দাগ কেটেছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s